পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি

 

পশ্চিম তীর ও গাজায় মানবিক সংকট: বসতি স্থাপন, আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বনেতাদের নীরবতা

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত আমাদের সময়ের অন্যতম বেদনাদায়ক ও বিতর্কিত মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট। কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা বাস্তুচ্যুতি, চলাচলে বিধিনিষেধ, সম্পত্তি ধ্বংস, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ, বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করে।

বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফিলিস্তিনিরা মনে করে যে বসতি সম্প্রসারণ একটি ভৌগোলিকভাবে কার্যকর ও স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে। বসতি বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং ফিলিস্তিনিদের জমিতে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ—সবকিছুই দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় “West Bank-এ অবৈধ বসতি” শব্দবন্ধটি প্রায়ই এমন বসতিগুলো বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি বলে বিবেচিত হয়।

গণহত্যা ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি

এই সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো বেসামরিক মানুষের ব্যাপক দুর্ভোগ। সামরিক অভিযান, সশস্ত্র হামলা, বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে।

এই মানবিক সংকট শুধু মৃত্যু ও আহত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু পরিবার তাদের বাড়িঘর হারিয়েছে, হাসপাতাল ও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো ব্যাহত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে।

জাতীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া একটি মৌলিক মানবিক নীতি।

গণহত্যা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিতর্ক

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সশস্ত্র সংঘাতের কারণে সৃষ্ট মানবিক দুর্ভোগ কমানোর জন্য বিভিন্ন নিয়ম নির্ধারণ করেছে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, আনুপাতিকতা বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট ধরনের সমষ্টিগত শাস্তি ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি নিষিদ্ধ করা।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা উচিত। বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত—তারা কোনো সরকার, সামরিক বাহিনী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য যেই হোক না কেন। রাজনৈতিক মিত্রতার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ভিন্ন হওয়া উচিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক

যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের অন্যতম শক্তিশালী কূটনৈতিক ও সামরিক মিত্র। ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

 

তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নের জন্য ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার জন্য একটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব—উভয় বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্বনেতাদের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক মানুষ ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের বিষয়ে world leaders' silence attitude বা বিশ্বনেতাদের নীরব মনোভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন।

বিভিন্ন সরকার বিবৃতি দিয়েছে, সহিংসতার নিন্দা করেছে এবং মানবিক সহায়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য হলো, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি অব্যাহত থাকা এবং রাজনৈতিক আলোচনা বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরিস্থিতিতে শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি যথেষ্ট নয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শক্তিশালী দেশগুলো কি শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করবে, নাকি বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন প্রতিরোধে বাস্তব ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবে?

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, কার্যকর পদক্ষেপের মধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, জবাবদিহি এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বাস্তব উদ্যোগ থাকা উচিত।

গত তিন বছর যাবৎ মার্কিন অন্ধ সাপোর্ট এর জন্য ইস্রায়েল মাথায় উঠেছে। তাদের সীমা লঙ্গণ বিশ্বের সাধারণ মানুষকে আহত করছে ? প্রায় ৭৫০০০ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং কয়েক লক্ষ মানুষকে আহত করেছে। মার্কিন উস্কানিতে ইস্রায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্গন করে ফিলিস্তিনে গণ হত্যা অব্যাহত রেখেছে। বিশ্ব মন্ডলের দল তা নীরবে উপভোগ করে যাচ্ছে। একটি দেশের নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে চলেছে। এই হত্যা বন্ধে বিশ্ব নেতারা কিছুই বলছে না। এইটা  মানব জাতির জন্য একটা কলঙ্কময় অধ্যায়। একটি অপরাধী দেশ ও সরকার ক্রমাগত অন্যায় করে চলেছে আর সারা বিশ্ব তাকে থামানোর জন্য কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিচ্ছে না সভ্য সমাজের জন্য এর চাইতে লজ্জার কি হতে পারে ?

জাতিগত নির্মূল ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি

ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি নিয়ে আলোচনায় “Ethnic Cleansing বা জাতিগত নির্মূল” শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়।

সাধারণভাবে এই শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা থেকে কোনো জাতিগত বা জাতীয় জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বা বেআইনি উপায়ে সরিয়ে দেওয়ার কর্মকাণ্ডকে বোঝায়।

সশস্ত্র সংঘাতের সময় বেসামরিক জনগণের বাস্তুচ্যুতি একটি অত্যন্ত গুরুতর মানবিক বিষয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বেসামরিক জনগণের জন্য সুরক্ষা প্রদান করে এবং বেআইনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

তাই বেসামরিক জনগোষ্ঠীর যেকোনো স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।

মানবতার জন্য এক মহাবিপর্যয়

চলমান এই সংঘাত একটি গভীর মানবিক বিপর্যয় বা catastrophe of human beings।

ফিলিস্তিনিরা ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কী করা উচিত?

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কয়েকটি মৌলিক লক্ষ্য অনুসরণ করা উচিত:

  1. জাতীয়তা বা পরিচয় নির্বিশেষে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
  2. প্রয়োজনে থাকা মানুষের জন্য অব্যাহত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
  3. আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ তদন্ত করা।
  4. গুরুতর অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
  5. বেআইনি বসতি সম্প্রসারণ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করা।
  6. বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা ও জিম্মি করার ঘটনা প্রত্যাখ্যান করা।
  7. একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে অর্থবহ আলোচনাকে উৎসাহিত করা।
  8. সব পক্ষের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা।

উপসংহার

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। অব্যাহত সহিংসতা, বসতি সম্প্রসারণ, বাস্তুচ্যুতি এবং রাজনৈতিক বিভাজন মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করছে এবং পুনর্মিলনের সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান শক্তিগুলোর দায়িত্ব হলো বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা, জবাবদিহি এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া।

শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন শুধু চুক্তি ও নীতিমালায় লিখিত কোনো ধারণা হয়ে থাকলে চলবে না—এটি সবার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিশ্বকে শুধু উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও প্রাণহানি রোধ এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পরিবেশ তৈরির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রয়োজনে অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইসরাইলকে থামাতে হবে।  তাদের এই গণহত্যা বন্ধ করতে হবে। অবৈধ সেটেলমেন্ট বন্ধ করতে হবে অন্যথায় বিশ্বব্যাপী ইহুদি বিদ্ধেষ জোরদার হবে। সহিংসতা বেড়ে যাবে। এমনকি ইস্রাইলি সরকারের এই ধরণের আচরণকে কেন্দ্র করে বিশ্ব যুদ্ধ পর্যন্ত ডেকে  আনতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Root Cause of Middle East Conflict

ISO 27001 Certification in Bangladesh

আমেরিকা ইস্রায়েল ও ইরান যুদ্ধ ২০২৬